২০১৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের আর্চবিশপের পালকীয় পত্র

0
74

পালকীয় মূলভাব: “আমরা প্রেরণের ফসল, প্রেরণ আমাদের আহ্বান”

ভূমিকা:
২০১৮ খ্রিস্টাব্দ ছিল আমাদের জন্য অতি আনন্দপূর্ণ ও গৌরবময় একটি বর্ষ। আমরা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছি আমাদের চট্টগ্রামে খ্রিস্টবিশ্বাসের গোড়াপত্তন ও ঐশ্বর্যময় ইতিহাসের বিষয়। পাঁচশত বছর পূর্বে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে কিছু পর্তুগীজ বণিকের মাধ্যমে খ্রিস্টবিশ্বাসের আগমন ঘটেছিল চট্টগ্রামে, তথা পূর্ববঙ্গে। ১৫৯৮ পর্যন্ত তাদের পালকীয় যত্নের জন্য কোন মিশনারী (যাজক বা সন্ন্যাসব্রতী) না থাকলেও তারা তাদের খ্রিস্টবিশ্বাস বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন, যাপন ও রক্ষা করেছে। দীর্ঘ ৮০ বছর পর মিশনারীগণ আসতে শুরু করলে খ্রিস্টিয় বিশ্বাসের যাত্রা নতুন গতি পায়। ইতিহাসে দেখি যে, খ্রিস্টিয় সমাজ প্রথম শতকের বছরগুলো অনেক কষ্ট ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। মিশনারী ফাদার ফ্রান্সেস্কো ফার্ণান্দেজ নির্যাতিত হয়ে মারা যান ও বঙ্গের প্রথম ধর্মশহীদ হন। কয়েকশত খ্রিস্টভক্তকে বিশ্বাসের কারণে আগুনে পুড়িয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয়। এই সমস্ত ইতিহাস অন্তরে ধারণ করে আমরা সবেমাত্র পালন করলাম বঙ্গে খ্রিস্টবিশ্বাস আগমনের পাঁচশত বর্ষপূর্তি জয়ন্তী উৎসব। এই উদ্দেশ্যে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ ছিল আমাদের জন্য প্রেরণ বর্ষ। জুবিলি উৎসবের পর আমাদের কৃতজ্ঞতা ও আনন্দপূর্ণ অনুভূতি ও প্রত্যয় হ’ল “আমরা প্রেরণের ফসল, প্রেরণ আমাদের আহ্বান”। পাঁচশত বছরের জুবিলি পালনের ফলশ্রুতি হিসাবে আমরা একটি নতুন ভাবধারার মণ্ডলী হবার গভীর ইচ্ছা পোষণ করি। তাই ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে আমাদের পালকীয় মূলভাব নির্ধারণ করা হলো: “আমরা প্রেরণের ফসল, প্রেরণ আমাদের আহ্বান”।

‘প্রেরণ’ খ্রিস্টমণ্ডলীর পরিচয়
খ্রিস্টমণ্ডলী হ’ল প্রেরণ-মণ্ডলী, কারণ যীশুর জীবন প্রেরণের জীবন, যীশুর পথ প্রেরণের পথ। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়: “পরমেশ্বর জগৎকে এতই ভালবেসেছেন যে, তাঁর একমাত্র পুত্রকে তিনি দান ক’রে দিয়েছেন, যাতে, যে-কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে, তার বিনাশ না হয়, বরং সে যেন লাভ করে শাশ্বত জীবন।” (যোহন ৩:১৬) পরমেশ্বরের প্রেম প্রকাশ করতে যীশু প্রেরিত হয়েছিলেন। একইভাবে যীশু শিষ্যদের পাঠিয়ে বলেন, “পিতা যেমন আমাকে প্রেরণ করেছেন, তেমনি আমিও তোমাদের প্রেরণ করছি।” (যোহন ২০:২১) তিনি আরও বলেন, “তোমরা জেরুশালেমে, সমগ্র যুদেয়ায় ও সামারিয়ায় এবং পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আমার সাক্ষী হবে।” (শিষ্যচরিত ১:৮) যীশুর প্রেরণ কাজ ছিল সকল মানুষের কাছে ঐশরাজ্য ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠা করা। সাধু পল বলেন, “ঐশরাজ্যের শুভবার্তা আমাকে প্রচার করতেই হবে। … আর আমি যে মঙ্গলসমাচার প্রচার করি, আমার তাতে বড়াই করবার কিছুই নেই, কেন না তা প্রচার না করে আমি পারি না। হায় রে আমি, মঙ্গলসমাচার যদি না প্রচার করি।” (১ম করি ৯:১৬)
পোপ ৬ষ্ঠ পৌল তাঁর ‘খ্রিস্টাদর্শ প্রচার’ নামক প্রৈরিতিক প্রেরণাপত্রে বলেন, “মঙ্গলবাণী প্রচার হ’ল মণ্ডলীর যথার্থ জীবনব্রত। তাই আমি আরও একবার সুনিশ্চিত ঘোষণা করতে চাই যে, মানবসমাজকে খ্রিস্টাদর্শে দীক্ষিত করার কাজই মণ্ডলীর অপরিহার্য ঐশ-নির্দিষ্ট কাজ। খ্রিস্টাদর্শ প্রচার আসলে মণ্ডলীকে দেওয়া বিশেষ ঐশ আশীর্বাদ ও ঈশ্বর-নির্দিষ্ট কর্তব্য তার নিবিড়তম পরিচিতি। খ্রিস্টাদর্শ প্রচারের জন্যই তার অস্তিত্ব।” (খ্রিস্টাদর্শ প্রচার # ১৪) ‘মঙ্গলবার্তার আনন্দ’ নামক প্রৈরিতিক পত্রে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস বলেন, “দীক্ষাস্নানের গুণে ঈশ্বরের জনগণের সকল সদস্যই প্রেরণকর্মী শিষ্য হয়ে উঠেছে (তুলনীয়: মথি ২৮:১৯)। সকল দীক্ষাপ্রাপ্ত মানুষ মণ্ডলীতে তাদের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, অথবা বিশ্বাস সম্বন্ধে তাদের শিক্ষার স্তর বা মাত্রা যা-ই হোক না কেন, তারা সবাই মঙ্গলবার্তা প্রচারক। সুতরাং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভক্তবিশ্বাসীদেরকে নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করে শুধু পেশাদার কর্মীদের দ্বারা খ্রিস্টাদর্শ প্রচারের পরিকল্পনা নিছক অর্বাচীনতার পরিচায়ক। মঙ্গলবার্তার নব্যপ্রচারের দাবি হচ্ছে প্রত্যেক দীক্ষাস্নাত ভক্তই যেন ব্যক্তিগতভাবে খ্রিস্টাদর্শ প্রচারকাজে আত্মনিয়োগ করে। বর্তমান সময়েই প্রত্যেক খ্রিস্টবিশ্বাসীর নিকট চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সক্রিয়ভাবে খ্রিস্টাদর্শ প্রচারের কাজে জড়িত হওয়া। আসলে, ঈশ্বরের মুক্তিদায়ী ভালবাসার অভিজ্ঞতা যার হয়েছে তার তো সেই ভালবাসা প্রচার করার জন্য খুব বেশি বা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। খ্রিস্টযীশুতে ঐশ্বরিক ভালবাসার পরিচয় যে খ্রিস্টবিশ্বাসী যতটুকু পেয়েছে, সেই পরিমাণেই সে প্রেরণকর্মী: আমরা আর বলি না যে আমরা ‘শিষ্য’ এবং ‘প্রেরণকর্মী’, বরং বলি, আমরা সবসময়ই ‘প্রেরণকর্মী শিষ্য’।” (মঙ্গলবার্তার আনন্দ # ১২০)
মঙ্গলবার্তা প্রচারে আদি মণ্ডলী আমাদের কাছে আদর্শ। প্রভু যীশু দু’জন ক’রে তার শিষ্যদের প্রেরণ করেন রুগিদের সুস্থ করতে, অপদূত তাড়াতে ও পাপের জন্য অনুতাপ প্রচার করতে (মার্ক ৬:৭-১৩; লুক ৯:১-৬)। মঙ্গলবাণীর শ্রোতাদের দায়িত্ব তা অন্যকে শোনানো (মথি ১১:৪)। প্রথম শিষ্যেরা যীশুর সাথে প্রথম দেখা হবার পর সাথে সাথেই আনন্দচিত্তে মঙ্গলবার্তা ঘোষণার কাজে নেমে পড়েছিলেন: “মসীহের দেখা পেয়েছি আমরা!” (যোহন ১:৪১) যীশুর সাথে কথোপকথন হওয়ার পরপরই সামারীয় নারী প্রেরণকর্মী হয়ে উঠেছিল এবং অনেক সামারীয় তার কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলো (দ্র: যোহন ৪:৩৯)। পুনরুত্থিত যীশুর সাক্ষাৎ পাবার পর নারীরা অন্য শিষ্যদের তা জানাতে চলে গেল। যীশু শিষ্যদের পাঠিয়ে বলেন যেন তারা সমস্ত সৃষ্টির কাছে মঙ্গলবাণী প্রচার করে। (মার্ক ১৬:১৫) শিষ্যচরিত গ্রন্থে আমরা বর্ণনা পাই যে, শিষ্যেরা যীশুর আদেশ মত বাণী প্রচারে বিভিন্ন স্থানে যাত্রা করেন। সাধু পিতরের সঙ্গে সহযোগিতা করেন পল ও তার সঙ্গী সিলাস, বার্ণাবাস ও তিমথী। প্রেরিত শিষ্য টমাস ৭২ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গলবার্তা প্রচার করতে ভারতে আসেন। ঠিক একইভাবে আমরা জগতে প্রেরিত তাদেরই খোঁজ করতে, যারা হারিয়ে গিয়েছে বা যাদের আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা প্রেরিত দয়া প্রকাশ করতে তাদের কাছে, যাদের দরকার সহমর্মিতা কারণ আমরা প্রভুর ভালবাসা পেয়েছি। সুতরাং মঙ্গলবার্তা প্রচারে দ্বিধা কেন, আর বিলম্ব কেন?

প্রেরণ ক্ষেত্র
প্রথমত: প্রেরণ ক্ষেত্র হলো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টবিশ্বাসীদের সমাজ। ধর্মপল্লীর খ্রিস্টভক্তদের চলমান পালকীয় যত্নের মাধ্যমে প্রতিটি খ্রিস্টবিশ্বাসীকে ও বিশ্বাসী সমাজকে গড়ে তোলা মণ্ডলীর প্রেরণকর্মের একটি বড় ক্ষেত্র। যেমন: সংস্কারীয় আধ্যাত্মিক যত্ন, ধর্মশিক্ষা, পরিবার পরিদর্শন, রোগীদের সেবা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত: মণ্ডলীর প্রেরণকাজ হল জগতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রভুযীশুর মঙ্গলবার্তা সবার সাথে সহভাগিতা করা। এই কাজে রয়েছে দূরবর্তী, প্রত্যন্ত ও নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত এলাকায় মঙ্গলবার্তা নিয়ে যাওয়ার জন্য কঠিন ও ত্যাগপূর্ণ প্রচার যাত্রা। আমাদের আর্চডাইয়োসিসে এখনও অনেক এলাকা কুমারী রয়ে গিয়েছে, যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু এলাকা, সমতল অঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকা এবং সমুদ্রের দ্বীপগুলো। যীশুর পরিচয় বা তাঁর পরিত্রাণের বার্তা এখনও কত মানুষ শুনতে পায়নি!
তৃতীয়ত: প্রেরণকাজ হল জগতকে খ্রিস্টিয় মূল্যবোধ ও চেতনা দিয়ে রূপান্তরিত করা, সমাজের যুযোপযোগি সংস্কার সাধন করা। যীশু বলেন, “তোমরা জগতের আলো, … তোমরা জগতের লবণ।” আমরা সংখ্যায় অল্প হলেও লবণ বা আলো হিসাবে সমাজে আমাদের গুণগত উপস্থিতি ও সক্রিয়তা দিয়ে সমাজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।
চতুর্থত: প্রেরণকর্মে নবজাগরণ। সমাজে অনেকে রয়েছে যারা দীক্ষিত, কিন্তু নানাবিধ কারণে তারা মণ্ডলী থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়েছে বা তাদের বিশ্বাসে ভাটা পড়েছে অথবা তাদের বিশ্বাস কমে গিয়েছে বা বিলুপ্ত হয়েছে। এই ধরণের মানুষের কাছে নতুন আঙ্গিকে বাণী প্রচার করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত: সৃষ্টির কাছে বাণী প্রচার। ঈশ্বর সব কিছুই মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। বর্তমান সময় ঈশ্বরের সৃষ্টি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সৃষ্টির যত্ন মণ্ডলীর একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রৈরিতিক ক্ষেত্র।
আমাদের কাছে দীক্ষাস্নানের দাবী হলো সমগ্র মণ্ডলী হিসেবে খ্রিস্টের প্রেরণ কাজে অংশগ্রহণ করা। এ’জন্য রয়েছে অনেক সুযোগ ও পথ। প্রত্যেক ভক্ত নিজ নিজ ঐশপ্রদত্ত অনুগ্রহ বা দানগুলো এই কাজে ব্যবহার করতে পারে। অধ্যয়ন, প্রার্থনা ও পবিত্র আত্মার প্রতি মুক্তমন সাহায্য করে ঐশদানগুলো আবিষ্কার করে গভীর আগ্রহের সঙ্গে তা ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রৈরিতিক কাজে সহভাগী হতে।

প্রেরণ দায়িত্ব
যাজক-সন্ন্যাসব্রতী:
যাজক ও সন্ন্যাসব্রতীগণ প্রেরণকাজের জন্য বিশেষভাবে আহূত, মনোনীত, গঠিত ও প্রেরিত। তারা যীশুর শিক্ষানুসারে বাড়ী-ঘর, ধনসম্পদ, আত্মীয়স্বজন ত্যাগ ক’রে প্রেরণ কাজের জন্য নিবেদিত ও সর্বত্র প্রেরিত। বারোজন প্রেরিত শিষ্যের মত তারা অপদূত তাড়াবার জন্য ও রোগব্যাধি নিরাময়ের জন্য পরাক্রম ও অধিকার লাভ করেছেন। তারা প্রেরিত হয়েছেন ঈশ্বরের রাজ্য প্রচার করতে ও পীড়িতদের সুস্থ করতে। যীশুর নির্দেশ: “পথের জন্য তোমরা কিছু নিও না, লাঠিও নয়, ঝুলিও নয়, রুটিও নয়, পয়সা-কড়িও নয়, দু’টো জামাও নয়। তোমরা যে কোন বাড়ীতে প্রবেশ কর, সেইখানে থাক, ও সেখান থেকে আবার যাত্রা কর।” (লুক ৯:৩)
যাজক-সন্ন্যাসব্রতীদের মনোভাব হবে যাদের কাছে প্রেরিত সেই মানুষের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে আপন করে নেয়া, তাদের ভাষা শেখা ও রীতিনীতি গ্রহণ করা। তাই তাদের নতুন নতুন কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে হয়। মানুষকে সেবাদানের উদ্দেশ্যে দৈহিক ও মানসিক আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতে মঙ্গলবার্তা প্রচার ও খ্রিস্টিয় সেবাকাজ করা তাদের দায়িত্ব। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনযাপন করা তাদের শিখতে হবে। যীশু বলেছেন, “তারা যা দেয়, তা-ই খাও, তা-ই পান কর, কেননা কর্মী মজুরির যোগ্য!” প্রেরণকর্মী হিসেবে যাজক-সন্ন্যাসব্রতীদের ত্যাগ করতে হয় নিজের দেশ ও আত্মীয়-স্বজনদের, ত্যাগ করতে হয় নিজের সময়সূচিকে। যীশুর আদেশ, “কেউ যদি আমার কাছে আসে ও নিজের পিতা, মাতা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, এমনকি নিজের প্রাণ পর্যন্ত ঘৃণা না করে, সে আমার শিষ্য হতে পারে না।” (লুক ১৪:২৭) তাদের প্রৈরিতিক জীবনে রয়েছে ঝুঁকি, কষ্ট, ক্লেশ, এমনকি নির্যাতন। যীশু বলেন “দেখ, আমি নেকড়ের দলের মধ্যে মেষেরই মত তোমাদের প্রেরণ করছি; সুতরাং তোমরা সাপের মত সতর্ক ও কপোতের মত সরল হও।” (মথি ১০:১৬) প্রেরণকর্মীদের দায়িত্ব, “আমি তোমাদের যা যা আজ্ঞা করেছি, সেই সমস্ত তাদের পালন করতে শেখাও। আর দেখ, আমি প্রতিদিন তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি যুগান্ত পর্যন্ত।” (মথি ২৮:২০)
ভক্তসাধারণ:
মণ্ডলীর প্রেরণকার্য মানুষের পরিত্রাণ/ মুক্তির সাথে জড়িত। আর এই মুক্তি খ্রিস্ট-বিশ্বাস ও তাঁর প্রসাদের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে আসে। কাজেই মণ্ডলী ও তার প্রত্যেক সদস্যের প্রৈরিতিক কাজের লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে কথায় ও কাজে খ্রিস্টের মঙ্গলবার্তা ঘোষণা করা এবং খ্রিস্টের অনুগ্রহ বিতরণ করা। দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভায় বলা হয় যে, ভক্তজনগণ তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে মণ্ডলীর প্রেরণকাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। … প্রথম, প্রচার ও পবিত্রীকরণ কাজের জন্য খ্রিস্টভক্তদের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। একটি খ্রিস্টিয় জীবনের সাক্ষ্য এবং ঐশ্বরিক মনোভাব সম্পন্ন সৎকাজ মানুষকে কার্যকরিভাবে বিশ্বাসের প্রতি এবং ঈশ্বরের প্রতি আকর্ষণ করতে পারে। (দ্র: মথি ৫:১৬) … দ্বিতীয়, খ্রিস্টভক্তগণ ঐক্যবদ্ধভাবে জাগতিক ব্যবস্থাসমূহ পুনর্গঠন করে তা আরো পরিপূর্ণ করে তোলেন। মণ্ডলীর দায়িত্ব হলো জনগণকে সঠিক মূল্যবোধ খুঁজে পেতে সাহায্য করা। পার্থিব ব্যবস্থার নবায়নকে তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সূচক কর্তব্যরূপে ভক্তজনগণকে গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়, সেবাকাজ ও সামাজিক সাহায্যদান। সেই জন্য দরিদ্র এবং পীড়িতদের প্রতি করুণা, দয়ার কাজ সকল এবং সকল প্রকার মানবীয় অভাব দূর করার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার কাজসমূহকে মণ্ডলীতে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে গণ্য করা হয়। আজকাল এই সমস্ত কার্যাবলী এবং দয়ার কার্যসকল আরও বেশী জরুরী এবং বিশ্ববিস্তৃত হয়ে পড়েছে। জগতে উপস্থিত থেকে সবকিছুকে ভিতর থেকে রূপান্তরিত করা ভক্তসাধারণের অনন্য কর্তব্য। (দ্র: ভক্তজনসাধারণের প্রৈরিতিক কাজ # ৬,৭,৮)
নাজারেথের যীশুর নাম, তাঁর শিক্ষা, তাঁর জীবন, তাঁর প্রতিশ্রুতি, তাঁর রাজত্ব ও ঈশ্বরপুত্র হিসাবে তাঁর পরিচয় ঘোষণা ছাড়া সত্যিকার বাণীপ্রচার নেই। যীশু খ্রিস্টই বাণী প্রচারের ভিত্তি, কেন্দ্র ও শিখর। পোপ দ্বিতীয় জন পল বলেন, “সময় এসে গেছে যখন
মণ্ডলীর সকল শক্তি ব্যয় করতে হবে মণ্ডলীর অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী প্রেরণকার্যে। খ্রিস্টবিশ্বাসী কেউ, মণ্ডলীর কোন প্রতিষ্ঠান এই সর্বোচ্চ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।”
পবিত্র আত্মা:
প্রেরণ কাজ একটি ঐশ্বরিক কাজ। প্রেরণ কাজের উৎস ও গন্তব্য পিতা ঈশ্বর। এই কাজের আদর্শ স্বয়ং যীশুখ্রিস্ট ও এর পরিচালক স্বয়ং পবিত্র আত্মা। প্রেরণকর্মীর অন্তরে রয়েছে তাঁর নীরব উপস্থিতি। পবিত্র আত্মার প্রেরণায় আদি মণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত ও প্রসারিত হয়েছিল।
পোপ ষষ্ঠ পৌল বলেন, “পবিত্র আত্মার ভূমিকা ছাড়া বাণী প্রচার কখনও সম্ভব হবে না। … পবিত্র আত্মার সহায়তায় খ্রিস্ট মণ্ডলী সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তিনিই খ্রিস্টবিশ্বাসীদের বুঝিয়েছিলেন যীশুর শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের অর্থ। … বাণী প্রচারের কলাকৌশল অবশ্যই ভাল, কিন্তু পরমাত্মার যে নিরব ক্রিয়া, তা সর্বোন্নত কলাকৌশল দিয়েও সরানো যায় না (প্রতিস্থাপন করা যায়না)। পবিত্র আত্মাকে বাদ দিয়ে মানুষের হৃদয়ের উপর অতিপ্রত্যয়-সঞ্চারী যুক্তি-তর্কেরও কোন শক্তি থাকে না। তাঁকে বাদ দিলে সমাজ-বিজ্ঞান অথবা মনোবিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করা অত্যন্ত উন্নত প্রকল্পগুলিকে অনতিবিলম্বেই মূল্যহীন মনে হয়।” (খ্রিস্টাদর্শ প্রচার # ৭৫)
তাঁর নীরব অথচ সক্রিয় উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই মণ্ডলীর একতায়, বিশ্বাসের শিক্ষায়, শিষ্যদের সাহসিকতা ও বিশ্বাসী ভক্তদের উদার সহভাগিতায়। পবিত্র আত্মা একতার আত্মা। আমরা দেখি আদিতে তিনি সকল ভক্তকে ভালবাসায় ঐক্যবদ্ধ/ সংঘবদ্ধ রেখেছিলেন। বিশ্বাসের শিক্ষায় তাদের জীবন আলোকিত ছিল। মঙ্গলবার্তা প্রচারে তাদের জীবন ছিল নির্ভীক। অনেকে সাক্ষ্যদানে জীবন উৎসর্গ করে ধর্মশহীদ হয়েছিলেন। আর সম্পদ সহভাগিতা দ্বারা প্রেরণকর্মে মণ্ডলী হয়ে উঠেছিল আত্মনির্ভরশীল। সুতরাং সফল ও কার্যকরী প্রেরণকাজের উদ্দেশ্যে পবিত্র আত্মার প্রতি আমরা প্রতিদিন মনোযোগী ও অনুগত থাকতে পারি।

প্রেরণ উপায়
প্রেরণকাজের জন্য প্রধান উপায়গুলো হল প্রেরণকর্মীর জন্য প্রার্থনা, তাদের কাজে উদারভাবে সাহায্য করা ও সম্ভব হলে নিজেরা প্রেরিত হওয়া।
প্রার্থনা করা:
স্বল্প সংখ্যক মানুষই নিজ বাড়ীঘর, আত্মীয়স্বজন ও এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অজানা জায়গায় মঙ্গলবার্তা প্রচার করতে যেতে চায় বা যেতে পারে। এই কাজে যারা এগিয়ে আসে বা ঈশ্বর যাদের প্রেরণ করেন, তাদের জন্য দরকার অন্যদের সমর্থন। তাদের মঙ্গলপ্রার্থনা করা, বৃহত্তর প্রেরণকর্মে জড়িত হওয়ার একটি বড় উপায়। সাধু যাকোব বলেন, “ধার্মিকের ভক্তিপূর্ণ প্রার্থনা কার্যশক্তি-মণ্ডিত।” (যাকোব ৫:১৬) ঈশ্বর বিশ্বস্ত ও ন্যায্য। তিনি আমাদের প্রার্থনা শোনেন ও আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সক্রিয় থাকেন। আমরা সকলে সর্বজাতির সবার কাছে যেতে পারি না, কিন্তু তিনি পারেন। আমরা প্রার্থনা করতে পারি, যেন তাদের হৃদয় আলোড়িত হয়। আমরা প্রার্থনা করতে পারি, যেন যাদের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়, তাদের মাঝে নবজাগরণ ঘটে। আমরা জানি ও বিশ্বাস করি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও তিনি আমাদের প্রার্থনা গ্রাহ্য করেন।
জন পাইপার বলেন, “মণ্ডলীর প্রেরণ যাত্রায় অন্ধকার ও অবিশ্বাসের শক্তির বিরুদ্ধে প্রার্থনা বহনযোগ্য বেতার টেলিফোনের মত মণ্ডলীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমরা দেখে আশ্চর্য হব না যখন প্রার্থনার ফল হয় না, কারণ আমরা নিজের ঘরে যোগাযোগের মাধ্যমে আরাম খুঁজি। যতক্ষণ না আমরা জানি জীবন একটি সংগ্রাম, ততক্ষণ আমরা জানি না প্রার্থনা কী: প্রেরণ যুদ্ধে সফলতা লাভের জন্যই প্রার্থনা।”
দান করা:
ঈশ্বর আমাদের বিভিন্নভাবে বিচিত্র দানে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রভুযীশু তাঁর জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাধ্যমে আমাদের পাপ ও স্বার্থপর ইচ্ছা ও সম্পদের বন্ধন থেকে মুক্ত করেছেন। ঈশ্বর উদারভাবে দান করার ও পবিত্র আত্মা যেখানে নিয়ে যেতে চান সেখানে যাবার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মণ্ডলীর প্রেরণকাজে আমাদের অনেক উদার হতে হবে। আমাদের উদার দান বিশ্বাস বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের আর্চডাইয়োসিসে যেসব ক্ষেত্রে আমাদের উদারতা প্রয়োজন, সেগুলো হলো: প্রেরণকর্মী যাজক-সন্ন্যাসব্রতীদের ভরণপোষণ, তাদের প্রচারযাত্রা ও চিকিৎসা, কাটেখিস্ট ও আর্চডাইয়োসিসের প্রেরণকর্মীদের প্রতিপালন, সেমিনারী ও গঠনগৃহের ব্যয়ভার নির্বাহ, প্রার্থনা-গৃহ ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অনুদান, ইত্যাদি। আমরা আদিতে গ্রহীতা ছিলাম, মিশনারী ও উপকারী বন্ধুগণ আমাদের দিয়েছেন। এখন আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রেরণ মণ্ডলী (মিশনারী) হিসেবে। আমাদের হতে হবে দাতা মণ্ডলী। আমরা আরও পারি পবিত্র আত্মার কাছ থেকে পাওয়া অনুগ্রহ, প্রতিভা, বিষয়সম্পদ মণ্ডলীর বিশ্বাস গঠনে ও বিস্তারে উদারভাবে ব্যবহার তথা দান করতে। সাধু পৌল বলেন, “উদারতার সঙ্গে যে বোনে, সে উদারতার ফসল কাটবে। … প্রফুল্লচিত্তে যে দান করে, তাকেই ঈশ্বর ভালবাসেন।”
প্রেরিত হওয়া:
“জাতি-বিজাতির মাঝে বর্ণনা কর তাঁর গৌরব, সর্বজাতির মাঝে তাঁর সমস্ত আশ্চর্য কাজ।” (সাম ৯৬:৩) “তখন যেরুশালেমে, সমস্ত যুদেয়া ও সামারিয়ায় এবং পৃথিবীর প্রান্তসীমা পর্যন্ত তোমরা আমার সাক্ষী হবে।” (শিষ্যচরিত ১:৮) আমরা সবাই প্রেরিত; খ্রিস্টের নিগূড় দেহ হিসাবে আমরা সকল জাতির নিকট প্রেরিত। মঙ্গলবার্তা প্রচারে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে প্রেরণকাজের যে কোন সুযোগ আমরা গ্রহণ করতে পারি। নিজে না পারলে আমরা আমাদের সন্তানদের দান করতে পারি যেন তারা যাজক হয়ে, সন্ন্যাসব্রতী হয়ে, ধর্মপ্রচারক হয়ে অন্যত্র গিয়ে প্রভুর বাণী প্রচার করতে পারে।

উপসংহার
আমরা যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, তিনিই প্রেরণ করেন তাঁর একমাত্র পুত্রকে জগতের পরিত্রাণের জন্য। তিনি ও তাঁর পুত্র প্রেরণ করেন পবিত্র আত্মাকে যিনি আমাদের মধ্যে সর্বদাই অবস্থান করেন ও আমাদের পূর্ণ সত্যের দিকে পরিচালনা করেন। প্রভুযীশু
মণ্ডলী স্থাপন করেছেন যেন পিতা ঈশ্বরের পরিকল্পনায় পরিত্রাণের কাজ জগতের শেষ দিন পর্যন্ত ও পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
মাত্র নিবেদিত যাজক ও সন্ন্যাসব্রতীগণই প্রেরিত নন; আমরা যারা দীক্ষিত তারা প্রত্যেকেই প্রেরিত, কারণ আমরা যীশুরই অতিন্দ্রীয় দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আমরা পেয়েছি পবিত্র আত্মার বিভিন্ন অনুগ্রহদান। এই দানের মাধ্যমেই আমরা পরিত্রাণের কাজে নিয়োজিত।
পাওয়া-হওয়া-দেয়ার যাত্রায় আমরা পথ চলেছি। আমরা উপলব্ধি করি, ৫০০ বছর ব্যাপী আমরা পেয়েছি আমাদের জীবন, খ্রিস্টবিশ্বাস, মিশনারী, ব্যক্তিগত জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, বিবেক, নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু, ঈশ্বরের কৃপা, অনুগ্রহদান, মণ্ডলী, ইত্যাদি। অনুধ্যান করি, আমরা সকলেই সাধনা করেছি মানুষ; পরমেশ্বরের সন্তান; প্রেরিত শিষ্য; উত্তম পিতা-মাতা, শিক্ষক, নেতা-নেত্রী, যাজক, সন্ন্যাসব্রতী, কাটেখিস্ট, ধর্মশিক্ষক; ন্যায় পরায়ন; ধার্মিক; দরদী ও ত্যাগী; সক্রিয় প্রেরণকর্মী; ঐশরাজ্যের নাগরিক; প্রভৃতি হয়ে উঠতে। পরিপক্ক মণ্ডলী হিসেবে আমাদের এখন দিতে হবে: প্রেরণকর্মীদের জন্য প্রার্থনা; প্রেরণকর্মীরূপে আমাদের সন্তান; প্রেরণকর্মের জন্য আর্থিক অনুদান; প্রেরণকর্মীরূপে খণ্ডকালীন সেবা; প্রেরণকাজের জন্য পরামর্শ; প্রেরণমুখী মনোভাব তৈরীতে সময়; প্রেরণকাজের জন্য সময়, প্রজ্ঞা ও সম্পদের ব্যবহার; অসহায়, দীনজন ও অসুস্থদের পাশে থাকা; শিশু-কিশোর-যুবদের গঠন; বিপথগামীদের সুপথে আনয়ন; মিলন সমাজ গঠনে সক্রিয়তা; প্রভৃতি।
অনেকের কষ্টসাধ্য বাণী প্রচারের ফসল আমরা। বাণীপ্রচার আমাদের ঐশ-আহ্বান। এই আহ্বানে আমার ব্যক্তিগত ভূমিকা কী আছে ও আরও কী হতে পারেন একেকজন যাজক হিসেব, সন্ন্যাসব্রতী হিসেবে বা খ্রিস্টভক্ত হিসেবে?
পিতা পরমেশ্বর আপনাদের সকলকে আশীর্বাদ করুন।

আর্চবিশপ মজেস কস্তা, সি.এস.সি.
চট্টগ্রাম আর্চডাইয়োসিস
২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

sixteen − 13 =