archbishop catechesis 2
archbishop catechesis 2

ধর্মশিক্ষা- : পরিবারে প্রভু যিশু

[ফেব্রুয়ারী- মার্চ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ]

পিতা, পুত্র ও পবিত্রাত্মা – এই তিন ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত ঐশ পরিবার।  এই পরিবারের দ্বিতীয় ব্যক্তি, পুত্র হিসেবে প্রভু যিশু-খ্রিস্ট ঐশ পরিবারের সদস্য।  ঐশ পরিবারের সদস্য যিশু-খ্রিস্ট মানব-দেহ ধারণ করে জগতে আমাদের মাঝে এলেন ও আমাদের মধ্যে বাস করতে লাগলেন।  অর্থাৎ যিশু-খ্রিস্ট ঐশ পরিবার থেকে উৎসারিত হয়ে মানব পরিবারে সংযুক্ত হলেন।  ঐশ পরিবার থেকে মানব পরিবারে যিশু-খ্রিস্টের আগমন, বিশেষভাবে একটি পরিবারে তাঁর জন্ম গ্রহণ জগতের পরিবারকে মর্যাদাপূর্ণ আসন দান করেছে।

. পরিবারে দম্পতির পারস্পরিক সম্পর্কে উপস্থিত প্রভু যিশু

খ্রিস্টিয় বিবাহ একটি সাক্রামেন্ত। যিশু-খ্রিস্ট ও খ্রিস্ট-মণ্ডলীর মধ্যকার যে ভালবাসাময় সম্পর্ক, তাঁর দৃশ্যমান চিহ্ন হচ্ছে মানব পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী’র মধ্যকার ভালবাসা, শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণের সক্ষমতা (দ্র: ইফি ৫:২১- ৬:১)।  ধর্মপত্রে সাধু পৌল ব্যাখ্যা করেছেন, বিবাহ শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের নিজ ও ব্যক্তিগত স্বতন্ত্র ভূমিকার বিষয় নয়। বরং খ্রিস্ট ও মণ্ডলীর মধ্যকার সম্পর্ককে মূর্ত করে  তোলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রতিটি দম্পত্তিকে। এই  বিষয়টিই তো খ্রিষ্টিয় বিবাহকে একটি সাক্রামেন্তে রূপান্তর করে।  খ্রিস্ট ও মণ্ডলীর মধ্যে যে গভীর ভালবাসা, বিবাহ সাক্রামেন্তে এক দেহে রূপান্তরিত দম্পতির মধ্যেও তো সেই ভালবাসাই কাম্য।  খ্রিস্ট ও মণ্ডলীর অস্তিত্বকে যেমন আলাদা করা যায় না, বিবাহ সাক্রামেন্তে একীভূত দেহ থেকে স্বামী ও স্ত্রীকেও তো আলাদা করা সম্ভব নয়।  তাই স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার স্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য।  মণ্ডলীর প্রতি যিশু-খ্রিস্টের যেমন পূর্ণ বিশ্বস্ততা আছে, স্বামী ও স্ত্রী’র পরস্পরের প্রতিও তেমনি পূর্ণ বিশ্বস্ততায় বিবাহ রূপান্তরিত হয় সাক্রামেন্তে।

. পিতামাতা সন্তানের বিশ্বাসের শিক্ষক

স্বামী ও স্ত্রী তাদের দাম্পত্য জীবনে একে অপরের ঐশ-বিশ্বাসকে রক্ষা ও সমৃদ্ধ করে।  সন্তান ধীরে ধীরে  বেড়ে ওঠার সময়কালে জগতের সাথে খাপ খাওয়ানোর সাথে সাথে স্বামী ও স্ত্রী  তাদের সন্তানের নিকট ঐশ বিশ্বাসকে হস্তান্তরও করে।  পিতা-মাতা তাই সন্তানের বিশ্বাসের প্রথম শিক্ষক।   সন্তানেরা পরিবারে  বেড়ে উঠতে উঠতে ঈশ্বর-জ্ঞান তো পিতা-মাতা’র কাছ থেকেই পায়, যে ভাবে যিশুও বয়সে, জ্ঞানে এবং ঈশ্বর ও মানব প্রীতিতে বেড়ে উঠেছেন।  প্রার্থনা শিক্ষা, গির্জায় নিয়ে যাওয়া, যিশুর প্রতি ভক্তি শিক্ষা, পবিত্র সাক্রামেন্ত সমূহের জন্য প্রস্তুতি (প্রথম কম্যূনিয়ন, পাপ-স্বীকার, খ্রিস্টযাগ, হস্তার্পণ, ইত্যাদি), খাবার আগের ও পরের প্রার্থনা শেখানো,  ঘুমানোর পূর্বের ও ঘুম থেকে ওঠার পরের প্রার্থনা শেখানো, দূত সংবাদ প্রার্থনা,  প্রতি সন্ধ্যায় পারিবারিক জপমালা প্রার্থনা-এসবই তো পিতা-মাতা স্বযত্নে তাদের সন্তানকে শেখাতে থাকেন। যিশুর বিভিন্ন গল্প বলা,  খ্রিস্ট মণ্ডলী সম্পর্কে জ্ঞান দান করা, নিজ জীবনের মাধ্যমে সন্তানদের সামনে ভাল ও খ্রিস্টিয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা- এগুলোর মাধ্যমে পিতা-মাতা সন্তানের বিশ্বাসের উত্তম শিক্ষক হয়ে ওঠেন এবং সন্তানেরা ঐশ মন্দিরের জীবন্ত পাথর হয়ে ওঠে।

.পারিবারিক মিলন সর্ম্পকে প্রভু যিশু

খ্রিস্টিয় পরিবারের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘মিলন সম্পর্ক’; আর পরিবারের এই মিলন সম্পর্কেই প্রভু যিশু উপস্থিত  থাকেন। অর্থাৎ পরিবারের মিলন সম্পর্ক হচ্ছে পরিবারে প্রভু যিশুর উপস্থিতির দৃশ্যমান চিহ্ন।  যিশু বলেন,  “যেখানে দুই বা তিন জন আমার নামে মিলিত হয় সেখানে আমি উপস্থিত।”  আর এই মিলিত হওয়ার জন্য  পরিবারে যে চর্চাগুলো জরুরী সেগুলো হল:

ক) পিতা-মাতা ও সন্তানেরা যেন প্রতিদিন একসাথে কিছু সময় কাটায়; মাত্র এক বাড়ীতে এক ছাদের নীচে থাকা নয়, কিন্তু পরিবার হিসেবে একসাথে সময় কাটানো; যেমন –

  • এক সাথে বসে যার যার মত টেলিভিশন দেখা নয় মাত্র, বরং কিছু কথাবার্তা বলা
  • দিনে অন্ততঃ একবার একসাথে খেতে বসা, যার যার মত আলাদা সময়ে আলাদা জায়গায় খেয়ে নেয়া নয়
  • শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও শিশু সন্তানকে সময় দেয়া, তার সাথে খেলাধূলা করা; শিশুদেরকে শুধু খেলনা/ মোবাইল দিয়ে ব্যস্ত রাখা নয়
  • পরিবারের সবাই মিলে বিভিন্ন ইনডোর খেলা ধূলা করা
  • পরিবারের সদস্যদের কারো কিছু বলার থাকলে সেগুলো মনযোগের সাথে শোনা।

খ) পিতা-মাতা ও সন্তানেরা যেন তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারের কেন্দ্র বিন্দুতে রাখে প্রভু যিশু- খ্রিস্টকে; যেমন-

  • সন্তানদের নিয়মিত ভাবে ম-লীর প্রার্থনা, পবিত্র বাইবেল ও ধর্মশিক্ষা দান করা
  • প্রতিদিন একসাথে সান্ধ্য প্রার্থনা করা: জপমালা প্রার্থনা বা প্রাহরিক প্রার্থনা
  • অন্ততঃ প্রতি রবিবার পরিবারের সকলকে নিয়ে এক সাথে পবিত্র খ্রিস্টযাগে অংশ গ্রহণ করা
  • পাড়া বা ওয়ার্ডের ক্ষুদ্র সমাজের শিক্ষা আসর, উপাসনা ও খ্রিস্টযাগ এবং পার্বন সমূহে পরিবারের সকলকে নিয়ে অংশগ্রহণ করা
  • নিজেদের সাধ্যানুযায়ী পরিবারের সকলে মিলে বিভিন্ন উপলক্ষ্য যেমন: বিবাহ বার্ষিকী, জন্ম-দিন, সাক্রামেন্ত গ্রহণ, ইত্যাদিতে উৎসব করা, পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ জানানো

উপরোক্ত বিষয় সমূহের চলমান চর্চায় খ্রিস্টিয় পরিবার হয়ে ওঠে গৃহ-মণ্ডলী যা খ্রিস্টের নিগূঢ় দেহ।  পরিবার নামক এই মণ্ডলীর মস্তক হলেন স্বয়ং প্রভু  যিশু-খ্রিস্ট আর পরিবারের অন্য সদস্যেরা হলো এই দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

আর্চবিশপ মজেস এম. কস্তা, সিএসসি

চট্টগ্রামের  আর্চবিশপ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

two + 8 =